একজন গবেষকের লেখায় পড়েছিলাম –আমার রবীন্দ্রনাথ, এই কথাটি বলা ধৃষ্টতার। সত্যিই তো এক জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশাল সমুদ্রে অবগাহন করা খুব সহজ কর্ম নয়। আর কাউকে পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ব করতে পারলেই না বলা যায়, সে বা তিনি আমার।

তারপরও আমাদের বাঙালির জীবনে এক অবিস্মরণীয় সত্তা রবীন্দ্রনাথ চেতনে-অবচেতনে বারবার আমার কাছে ফিরে আসেন; তখন ভ্রান্তিকে ছুড়ে ফেলি নিজের নির্বুদ্ধিতা অপনোদনের জন্য, অতঃপর সেই রবীন্দ্রনাথ একান্ত আমার হয়ে ওঠেন। তাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু বলতে গেলে, লিখতে গেলে ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ না বলে উপায় থাকে না। হোক না তা ধৃষ্টতার।

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ, ভ্রান্ত। কোনো মহান ব্যক্তির পূর্ণ পরিচিতি আমাদের সামনে তুলে ধরা হয় না। ছোটোবেলায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কত গালগল্প শুনেছি, তার শেষ নেই। শুনতাম, রবীন্দ্রনাথের ষড়যন্ত্রে কাজী নজরুল ইসলামের মতো একজন বড় কবি নোবেল পুরস্কার পাননি। শুনতাম যে হিন্দু মেয়েকে নজরুল বিয়ে করেছেন, সে নাকি রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়, যেটি রবীন্দ্রনাথ মেনে নিতে পারেননি। আরও শুনতাম রবীন্দ্রনাথ হিন্দুদের কবি, মুসলমানদের নন। এসব শুনেই বড় হয়েছি। শিক্ষকদের প্রশ্ন করলে কোনোদিন আমাদের এই ভুল ভেঙে দেননি। হয়ত তাঁরাও জানতেন না রবীন্দ্রনাথের সবটুকু। কারা যেন আমাদের কোমল মস্তিষ্কে এগুলো ঢুকিয়ে দিত। সে কারা? হাওয়ায় উড়ে বেড়ানো কোনো নিন্দুক অথবা ষড়যন্ত্রকারী! আমরা তাদের চিনতে পারি না, ধরতে পারি না। কিন্তু বুঝতে পারি, তারা আছে আমাদের চারপাশে। আমাদের সময়ে সবসময় লক্ষ করেছি, কে বড়, রবীন্দ্রনাথ না নজরুলÑ এটির একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলত কথায়, আলোচনায়। তখন তো মানুষের কবি নজরুলের ইসলামীকরণ চলছে। প্রাথমিক শিক্ষায় আমাদের পাঠ্য ছিল নজরুলের ‘নতুনের গান’ অথবা ‘চল্ চল্ চল্’ (এখন দেখি এই কবিতার নাম আর ‘নতুনের গান’ নেই, সঞ্চিতাসহ সর্বত্র লেখা হচ্ছে ‘চল্ চল্ চল্’) কবিতাটি। যা রণসংগীত নামে আমাদের কাছে পরিচিত। কবিতাটির কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি:
ঊষার দুয়ারে হানি’ আঘাত
আমরা আনিব রাঙা প্রভাত,
আমরা টুটাব তিমির রাত,
বাধার বিন্ধ্যাচল।

নব নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব মহাশ্মশান,
আমরা দানিব নতুন প্রাণ
বাহুতে নবীন বল!

আমরা দেখব, উদ্ধৃতির শেষ পর্বের দ্বিতীয় চরণে আছে ‘সজীব করিব মহাশ্মশান’। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে ছিল ‘সজীব করিব গোরস্থান’। কবিতাটির এই পর্ব মাত্রাবৃত্ত ছন্দে ৬+৫+৬+৫+৬+২ মাত্রায় রচিত। ‘মহাশ্মশান’ এর জায়গায় ‘গোরস্থান’ লিখলে একমাত্রা কম হয়। এতে কবিতাটি খঞ্জ হয়ে যায়, সেটা অশুভ কারিগররা বোঝেননি। তাদের প্রয়োজন ছিল নজরুলের কবিতায় কোথায় সংস্কৃত, হিন্দুসংস্কৃতি ছোঁয়া শব্দ আছে, সগুলোর ইসলামীকরণ করা। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল রবীন্দ্রনাথকে পাঠ্যপুস্তক থেকে মুছে ফেলা। গণমাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের গান প্রচার ছিল নিষিদ্ধ। এমন একটি সময়ে আমরা যখন বেড়ে উঠেছি, রবীন্দ্রনাথের প্রতি আমাদের অবজ্ঞা আমাদের অজান্তেই আমাদের মনে গেঁথে দেয়া হয়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশে পাঠ্যপুস্তকে জীবন্ত হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর কবিতা, ছড়া পাঠ করে মুগ্ধ হয়েছি। তাঁর ‘কাবুলিওলা’, ‘ছুটি’ এবং ‘পোস্টমাস্টার’ এর মতো গল্প পড়ে মন খারাপ করেছি। এ তো শৈশব, কৈশোরের কথা। প্রথম যৌবনেও রবীন্দ্রনাথ সীমাবদ্ধ ছিলেন পাঠ্যপুস্তক আর ‘সঞ্চয়িতা’র মধ্যে। তাঁকে আত্মস্থ করার সাধ্য হয়ে ওঠেনি। রবীন্দ্রনাথকে ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই হাতে পাই ‘উন্মেষ’। কমিউনিস্ট পার্টির গণ সাংস্কৃতিক আন্দোলন থেকে মহসিন শস্ত্রপাণি এই মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। কলেজ জীবনে বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় এ ধরনের পত্র-পত্রিকা নিয়মিত হাতে আসত। ‘উন্মেষ’ পত্রিকায় ধারবাহিকভাবে লেখা হত রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করে। আজ তার খুব বেশি মনে নেই। তবে বুর্জোয়া, প্রতিক্রিয়াশীল এক রবীন্দ্রনাথ আমার চেতনায় মূর্ত হয়ে উঠেছিল।
১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে একবার কলকাতায় যাই। কলকাতায় এসে পরিচয় হয় খ্যাতিমান গবেষক, লেখক নারায়ণ চৌধুরী ও কলকাতা গবেষক রাধারমণ মিত্রের সঙ্গে। দুজনই রবীন্দ্রনাথবিরোধী লেখক। আলাপ-আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁদের বিস্তর অভিজ্ঞতার কথা শুনি। নারায়ণ চৌধুরী কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘লেখক সমাবেশ’ পত্রিকার একটি সংখ্যা আমাকে দিয়েছিলেন। এ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর একটি প্রবন্ধ ছিল। আর একটি প্রবন্ধ ছিল আহমেদ শরিফের। নারায়ণ চৌধুরীর প্রবন্ধে ছিল রবীন্দ্রনাথের বুর্জোয়া চরিত্রের বিশ্লেষণ। আর আহমেদ শরীফের প্রবন্ধে ছিল রবীন্দ্রনাথের মতো অতীন্দ্রিয়বাদী কবিকে নিয়ে মাতামাতির বিষয়। তিনি এ প্রবন্ধের এক জায়গায় বলেছিলেন এমন কথাÑ আমরা দিনে যতবার সৃষ্টিকর্তার নাম উচ্চারণ করি, তার চাইতে বেশি উচ্চারণ করি রবীন্দ্রনাথের নাম।

এর আগে আহমদ শরীফের লেখা পড়েছি। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, রবীন্দ্র-সাহিত্য আর আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে না। বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকার পত্রিকায় ‘রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র-মূল্যায়ন’ নামে একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যেসব অভিযোগ তিনি তুলে ধরেছিলেন তার তালিকা দীর্ঘ। রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব বা কবিগুরু বলার ঔচিত্য নিয়ে তাঁর প্রশ্নের শুরু। তারপর তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ উনিশ শতকী কবি এবং বিশ শতকী বুদ্ধিজীবী, তবে তাঁর রচনায় এমন কিছু নেই যা পাশ্চাত্য চিন্তা ও সংস্কৃতিতে ছিল না; নোবেল পুরস্কারপ্রাপকরূপে নিজের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে তিনি বিশ্বজনীন মানবিক চিন্তার কথা বলেছেন; রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের ভুল ব্যাখ্যাতা, পৌরাণিকতার মোহে আচ্ছন্ন, ব্রাহ্মমতের যথাযথ অনুধাবনে অপারগÑ তিনি ব্রাহ্মদের হিন্দু আখ্যা দিয়েছেন এবং আস্থা স্থাপন করেছেন প্ল্যানচেটে; প্রাচীন পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে এবং বৌদ্ধ, রাজপুত ও শিখ আখ্যান নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন, কিন্তু মুসলিম শাসক ও দরবেশ নিয়ে কিছু লেখেন নিÑ তাতে মনে হয়, মুসলমানদের প্রতি তিনি বিদ্বিষ্ট ছিলেন অথচ ইংরেজ শাসকদের প্রতি তাঁর অপরিমেয় অনুরাগ, গভীর আস্থা ও নিবিড় শ্রদ্ধা দেখা যায়; তাঁর গল্পে-উপন্যাসে গণমানবের স্থান হয়নি, তিনি তাদের কল্যাণকামী ছিলেন না; তাঁর মনের গভীরে ছিল সামন্তবাদের প্রতি মোহ অথচ উপনিবেশে তাঁর ঘৃণা ছিল না; তিনি জমিদারি উচ্ছেদের বিরোধী ছিলেন, নিজেও ছিলেন নিপীড়ক জমিদার। এমন এন্তার অভিযোগ।

রবীন্দ্রনাথের জমিদারি সম্পর্কেও আহমদ শরীফের নিন্দার শেষ নেইÑ তাঁদের কোনো দানধ্যান তো ছিলই না, বরঞ্চ গ্রামবার্ত্তা-প্রকাশিকার বিবরণ-অনুসারে স্বার্থপরবশ হয়ে তাঁরা গ্রামও ধ্বংস করে দিয়েছেনÑ ভিত্তি ছিল তাঁর কাছে লেখা আবুল আহসান চৌধুরীর পত্র। আবুল আহসান চৌধুরী জানিয়েছিলেন যে, ওই ঘটনা সম্পর্কে তাঁর সংগৃহীত গ্রামবার্ত্তা-প্রকাশিকায় তিনি কিছু পাননি, তবে কাঙ্গাল হরিনাথের মৃত্যুর পরে সাহিত্য পত্রিকায় (সনতারিখ বা সংখ্যা দেননি) তাঁর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় এ-কথা বলেন। তাতে রবীন্দ্রনাথ এতই বিরক্ত হন যে, নাটোরের মহারাজাকে বলে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের ‘রাণী ভবানী’ বইটি প্রকাশের জন্যে প্রতিশ্রুত সাহায্য বন্ধ করে দেন। ঠাকুর এস্টেটের প্রজাদের ওপর কুঠির কর্মচারীদের অত্যাচারের ঘটনা উল্লেখ করে আবুল আহসান চৌধুরী আরো জানিয়েছিলেন যে, এর কিছু কিছু ঘটে রবীন্দ্রনাথেরই ইঙ্গিতে, তবে এই কথার সপক্ষে কোনো প্রমাণ তিনি দাখিল করেননি। এ তো গেল আহমদ শরীফের কথা।

নারায়ণ চৌধুরী বলেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সমালোচনা কেউ সহ্য করে না। তা সব জায়গাতেই। কেন রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করা যাবে না, দেবতারাও কি সমালোচনার উর্দ্ধে?”

রাধারমণ মিত্রের রবীন্দ্রঅভিজ্ঞতা তাঁর নিজের জীবনের গল্প নিয়ে। প্রখ্যাত এই গবেষকের বয়স তখন তিরাশি। লিফট ছাড়াই ওঠানামা করেন বহুতল ভবনের শেষ তলায়। নিজে বাজার করেন, নিজেই রান্না করেন। পরিবার পরিজন বলতে কেউ নেই। দেখা করতে গেলে রবীন্দ্রনাথের কথা ওঠে। তিনি আমাকে রবীন্দ্রনাথের এলাকার লোক বলে সম্মোধন করেন। প্রশ্ন করেন, “পিরালী ব্রাহ্মণ কী জানেন?” রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষের ভিটা ছিল যশোরের পিঠাভোগে। তাঁরা পিরালী ব্রাহ্মণ। বিষয়টি বিস্তারিত আমার জানা ছিল না। তিনি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। বলেন, “যশোরে থাকেন আর পিরালী ব্রাহ্মণ কী তা জানেন না?” এরপর তিনি ব্যাখা করেন রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষের ইতিহাস।

পিরালী ব্রাহ্মণ বাংলার ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের একটি ‘থাক’ বা ‘উপসম্প্রদায়’। কথিত আছে যে, খলিফাতাবাদের প্রতিষ্ঠাতা ও দক্ষিণাবর্তের শাসক ছিলেন হযরত খান জাহান আলী। তিনি ছিলেন পীর-এ-কামেল। তাঁকে সবাই সংক্ষেপে পিরালী বলে ভাবত বা সম্বোধন করত। তাঁর কর্মচারী ছিলেন যশোরের চেঙ্গুটিয়ার গুড় চৌধুরী বা রায়চৌধুরী বংশোদ্ভূত জয়দেব ও কামদেব। একদিন রমজানের সময় রোজা রেখে দরবার গৃহে বসেছিলেন খানজাহান আলী। জয়দেব ও কামদেব এবং অন্যান্য কর্মচারীরাও সেখানে ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি দরবার গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করে একটি বাটি হাতে প্রবেশ করেন এবং বাটিতে রাখা একটি সুগন্ধি লেবু পিরালীকে উপহার দেন। পিরালী লেবুর ঘ্রাণ নিচ্ছিলেন। এমন সময় কামদেব বলেন হুজুর, ‘ঘ্রাণে অর্ধভোজনÑ আপনি গন্ধ শুঁকে রোজা ভেঙে ফেললেন?’ এ কথায় পিরালী মনে মনে ক্ষুব্ধ হন কামদেবের প্রতি। তারপর গোপনে পরামর্শ করে স্থির করেন, একদিন তিনি সমস্ত কর্মচারীদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবেন। নিমন্ত্রণের নির্ধারিত দিনে কামদেব ও জয়দেব সভাস্থলে উপস্থিত হলেন। সভাগৃহের প্রাঙ্গণে নানারকম মশলা সহকারে গোমাংস রান্না হচ্ছিল। রান্নার গন্ধে চারপাশ ভরপুর। গোমাংস রান্না হচ্ছে বুঝতে পেরে জয়দেব ও কামদেব নাকে কাপড় দিয়ে গন্ধ প্রতিরোধের চেষ্টা করছিলেন। তখন পিরালী তাদের নাকে কাপড় দেবার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। অতঃপর কামদেব মাংস রান্নার গন্ধের কথা উল্লেখ করেন। তখন পিরালী লেবুর গল্প উল্লেখ করে বলেনÑ ‘এখানে গো-মাংস রান্না হচ্ছে। এতে আপনার অর্ধেক ভোজন হয়ে গেছে। সুতরাং আপনি জাতিচ্যুত হয়েছেন।’ খান জাহানের কথার মারপ্যাচে পড়ে অতঃপর জয়দেব ও কামদেব গোমাংস খেয়ে মুসলমান হয়ে যান। পিরালী তাঁদের জামাল উদ্দীন, কামাল উদ্দীন খাঁ চৌধুরী উপাধি দিয়ে আমত্য শ্রেণীভুক্ত করে নেন। জয়দেব, কামদেব মুসলমান হবার পর গোঁড়া হিন্দুরা তাঁদের পরিবার-স্বজনদের একঘরে করে দেন। সংশ্রব দোষে তাঁদের অন্য দুই ভাই শুকদেব ও রতিদেব পিরালী ব্রাহ্মণ নামে সমাজে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তারপর থেকে রায়চৌধুরী পরিবারের লোকেরা পুত্র কন্যার বিয়ে নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন। খুলনা জেলার আলাইপুরের পূর্বদিকে পিঠাভোগে ছিল কুশারীদের নিবাস। পীঠাভোগের কুশারীগণ রায়চৌধুরীদের সাথে আত্মীয়তা করে পিরালী বলে সমাজে নিগৃহীত হয়। পূর্বে যশোর, বর্তমান খুলনা জেলার অন্তর্গত পিঠাভোগ গ্রামের কুশারীরা চৌধুরীদের মতো শক্তিশালী প্রবল শ্রোত্রিয় জমিদার ছিলেন। তাঁর শাণ্ডিল্য ভট্টনারায়ণ পুত্র দীননাথ কুশারীর বংশধর। কুশারী বংশের জগন্নাথ কুশারী থেকেই পরবর্তীকালে কোলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বংশের প্রতিষ্ঠা হয়। কুশারীদের উত্তরপুরুষ পঞ্চানন কুশারী সেই সময় ইংরেজ কাপ্তেনদের খাদ্যসামগ্রী, জল সরবরাহের কাজ করতেন। ওই শ্রমসাধ্য কাজে পঞ্চাননকে সাহায্য করতেন এলাকার খেটে খাওয়া মানুষজন। আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণসন্তান বলেই, পঞ্চাননকে তারা ‘ঠাকুরমশাই’ বলে ডাকতেন। সেই থেকে ধীরে ধীরে কুশারী পদবী হারিয়ে যায় ‘ঠাকুর’ সম্বোধনের আড়ালে।

অন্য একটি তথ্যে বলা হয় যে, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃপুরুষের আবাসভূমি খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার অন্তর্গত ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ গ্রামে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধরের মধ্যে দীননাথ কুশারীর অষ্টম পুরুষ তারানাথ কুশারী ভৈরব-তীরবর্তী পিঠাভোগ গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তারানাথ কুশারীর দুই পুত্র রামগোপাল ও রামনাথ। রামগোপালের পুত্র জগন্নাথ কুশারীই ছিলেন ঠাকুর বংশের আদি পুরুষ। যিনি খুলনা জেলার ফুলতলার দক্ষিণডিহি নিবাসী শুকদেব রায়চৌধুরীর এক কন্যাকে বিয়ে করে পিরালী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ভুক্ত হয়ে ‘বৈবাহিক দোষে দুষ্ট’ হয়ে জাতিচ্যুত হন।

জানা যায়, পিরালী সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য বহন করত। কোলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার, সিঙ্গিয়ার মুস্তফী পরিবার, দক্ষিণ ডিহির রায়চৌধুরী পরিবার, খুলনার পিঠাভোগের ঠাকুর পরিবার, এই পিরালীদের উত্তরাধিকার হিসেবে চিহ্নিত। কবি রবীন্দ্রনাথও এই পিরালী ঠাকুর পরিবারেই সন্তান।

সব কথা কাহিনিÑ কিংবদন্তি হয়ে আছে। পিরালী ব্রাহ্মণ সম্পর্কে অনেকগুলো কাহিনি প্রচলিত। কোনটি সঠিক, সেটা নির্ণয় করা কঠিন। আমি রাধারমণ মিত্রের কাছ থেকে যেটুকু জেনেছিলাম, সেটুকুই উল্লেখ করেছি মাত্র।

যাহোক, আমি মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। পিরালী ব্রাহ্মণদের ইতিবৃত্ত শুনিয়ে রাধারমণ মিত্র চুপ রইলেন না। তিনি বলতে থাকেন রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া, তিনি মুসোলিনীর মতো বর্বর শাসককে সমর্থন করেছেন, অহংকারী এবং কোনোক্রমেই তিনি প্রজাহিতৈষী জমিদার, এমনকি মানবদরদী কবিও নন। আমি রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’, ‘সামান্য ক্ষতি’, ‘ওরা কাজ করে’ এমনই বিভিন্ন কবিতার কথা উল্লেখ করি। তিনি বলেন, এসব কিচ্ছু না, ভান, কপটতা। রবীন্দ্রনাথ নাকি এতখানি অহঙ্কারী ছিলেন, যে কেউ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম না করলে বা পায়ের ধুলো না নিলে তার সাথে কথা বলতেন না। মিত্র মহাশয় এবার শুনান তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা। তিনি তখন রাজনীতিতে এসে তুখোড় বক্তা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। পত্র-পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। লোকে হতবাক, একটি তরুণ ছেলের বাকপটুতায়। ঠাকুর বাড়িতে যাতায়াত ছিল ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রাহক, খ্যাতিমান লেখক ও গবেষক দীনেশচন্দ্র সেনের পুত্র অরুণ সেনের। তিনি রাধারমণের ঘনিষ্ট বন্ধু। একদিন রবীন্দ্রনাথ অরুণের কাছে জানতে চান, এই বিস্ময় তরুণ সম্পর্কে। তিনি জেনেছেন, যে রাধারমণ কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিলে নাকি কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার লোক দাঁড়িয়ে যায়। সে অরুণ সেনের বন্ধু জানার পর, রবীন্দ্রনাথ রাধারমণকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে বলেন। এ খবর পেয়ে রাধারমণের ঘুম হারাম হয়ে যায়। কেননা, রবীন্দ্রনাথের মতো বিখ্যাত ব্যক্তি তাঁর সাথে কথা বলতে চান, এটা তাঁর কাছে বিস্ময়ের ও আনন্দের। একদিন অরুণ সেন তাঁর বন্ধুকে নিয়ে ঠাকুর বাড়িতে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তখন চেয়ারে বসে ছিলেন। অরুণ ঘরে ঢুকেই কবির পায়ের ধুলো নিয়ে রাধারমণকে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু রাধারমণ কবির পা ছুঁয়ে প্রণাম না করে, শুধু দুহাত জোড় করে কবিকে নমস্কার জানান। এরপর কবি গম্ভীর হয়ে যান। কোনো কথা বলেন না। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায় দুই বন্ধুর। তাঁরা অনেকক্ষণ বসে থাকেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোনো কথাই বলেন না। অরুণ সেন সাহিত্যের বিষয় নিয়ে কবির সাথে আলোচনার সূত্রপাত করেন। তারপরও কবি মুখ খোলেন না। অতঃপর অপ্রস্তুত হয়ে তাঁরা ঠাকুরবাড়ি পরিত্যাগ করেন। এরপর অরুণের সঙ্গে বন্ধুত্বের ইতি ঘটে রাধারমণের। অরুণের অভিযোগ ছিল, রাধারমণ তাঁর মতো করে কবির পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করেনি কেন? আর রাধারমণের অভিযোগ ছিল, এমন একজন অহঙ্কারী, বাজে মানুষের কাছে অরুণ নিয়ে এল কেন?

এসব কথা রাধারমণ মিত্র বলছিলেন অনেকটা উত্তেজিত হয়ে। এরপর বলেন আরও একটি ঘটনার কথা। সেটা হল, ব্রিটিশরাজের ভারতসচিবের জনসভা উপলক্ষে ময়দানে হাজার হাজার মানুষের ঢল। নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও আমন্ত্রিত। রাধারমণ দেখলেন, রবীন্দ্রনাথ গাড়িতে চড়ে আসছেন। সঙ্গে পুত্র রথীন্দ্রনাথ। কিন্তু প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে গাড়ি এগোতে পারছে না। রাস্তার পাশ ঘেষে গাড়ি দাঁড়িয়ে। ড্রাইভার গাড়ির গ্লাস নামিয়ে দিয়েছে। ঠিক সেসময় একজন ভিক্ষুক ভিক্ষার জন্য হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে গাড়ির ভেতর। রবীন্দ্রনাথ ধমক দিয়ে সরিয়ে দিলেন ভিখারীকে। তারপর গ্লাস নামিয়ে দেবার অপরাধে ড্রাইভারকে গালিগালাজ করতে থাকলেন। যেটা রাধারমণ স্বচক্ষে দেখেছেন এবং নিজের কানে শুনেছেন। এ ঘটনার কথা বলে তিনি বললেন,Ñ “এই হচ্ছে আপনাদের মানবদরদী কবি রবীন্দ্রনাথ!”

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এসব গল্প বা ঘটনার কথা শুনে ভেতরে ভেতরে একটি নেতিধারণা গড়ে ওঠে। পরে ‘নন্দিত ও নিন্দিত রবীন্দ্রনাথ’ নামে একটা লেখা তৈরি করি। যেটা ছাপা হয়েছিল ধারাবাহিকভাবে ‘দৈনিক ভোর’ পত্রিকায়। সেটি উল্লেখ করার আগে যে কারণে আমাকে বহুল তিরস্কৃত হতে হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গে আসি। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মে ‘দৈনিক সংবাদ পত্রিকা’য় ময়মনসিংহ নিবাসী লেঃ কর্নেল (অবঃ) এইচ আহমেদের একটি চিঠি প্রকাশিত হয়। ‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’ শীর্ষক পত্রে তিনি ঢাকার রমনা পার্ককে ‘রবীন্দ্র পার্ক’ এবং পার্ক এভিনিউর নাম ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এভিনিউ’ রাখার প্রস্তাব করেন। একইসঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে পার্কের নাম ‘নজরুল পার্ক’ নামকরণের কথা বলেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মবার্ষিকী জাতীয় পর্যায়ে পালনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এ চিঠির প্রতিক্রিয়ায় ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুন তারিখে মধুসূদনকে আমি আমাদের জাতীয় কবি বলে অভিহিত করে আমার মতামত প্রকাশ করি। এতে আমি লিখি, “কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত আধুনিক সাহিত্যের স্রষ্টা। মধুসূদনের বঙ্গভাষা প্রীতি এবং তাঁর সার্থক চর্চায় নবজীবন লাভ করেছে বাংলা ভাষা। মধুসূদনেরই চর্চিত ও কর্ষিত উর্বর অববাহিকাতেই পরবর্তীকালে রবীন্দ্র্রনাথ ও নজরুল সাহিত্যচর্চা করে মহীরুহতে পরিণত হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের আবির্ভাব না ঘটলে আমাদের সাহিত্যের অগ্রগতি ব্যাহত হত কিন্তু মধুসূদনের আবির্ভাব না হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তার পঙ্গু দশা থেকে মুক্তি পেত না সহজেই। মধুসূদনই সর্বপ্রথম আমাদেরকে বিশ্বের কাছে বাঙালি বলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সাহস যুগিয়েছিলেন এবং জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। মেঘনাদবধ কাব্য এবং তাঁর অনেক কবিতার মধ্য দিয়ে তার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে। তাই আমার বিবেচনায় মাইকেল মধুসূদন দত্তই আমাদের জাতীয় কবি।” আমার এই বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে কয়েকটি চিঠি ছাপা হয়।

তারপর একই বছরের ২১ জুলাই ঐ পত্রিকায় আমার আর একটি চিঠি ছাপা হয়। লেখাটি যে খুব গুছিয়ে লিখেছিলাম, এমন নয়। এই লেখায় নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথকে আমি আক্রমণ করি। আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এটা ছিল এক অর্বাচীনসুলভ লেখা। আমি নারায়ণ চৌধুরীর বক্তব্যের সত্যতা মিলিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম। চিঠিটি এখানে তুলে ধরছি।

শিরোনাম ছিল ‘কবি মধুসূদন: রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ভিন্ন চোখে’। এতে লিখি, “ইদানীং পত্র-পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়শই চোখে পড়বে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে নিয়ে অন্তহীন আলোচনা-সমালোচনা। ব্যাপারটি বেশি মুখরোচক হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল জয়ন্তী পালনের পর থেকেই। এটা আমাদের জন্য সুখের বিষয় যে, দুজন কবিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা হয়েছে। অবশ্য দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা আমরা জানি, যেখানে কৃচ্ছতা সাধনের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে অসংখ্য কবি-অকবি-সাহিত্যিক-অসাহিত্যিক, ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে দুটি জাতীয় অনুষ্ঠান পালন কৃচ্ছতা সাধনের পর্যায়ে পড়ে কিনা ভেবে দেখা যেতে পারে। অনুষ্ঠান দুটি জাতীয় উদ্দেশ্যে, না রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। যেখানে ভারতের মতো বিশাল দেশে রবীন্দ্রজয়ন্তী রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পালন করা অদ্যাবধিও হয়নি (যে কথা সুবিনয় ঘোষ স্বীকার করেছেন), সেখানে রবীন্দ্রনাথের মতো একজন বুর্জোয়া, জমিদার, সম্রাটসর্বস্ব কবিকে নিয়ে বেশি মাতামাতি দৃষ্টিকটু বৈকি! মানবতাবাদের মানসপুত্র কাজী নজরুল ইসলামকে ভারতে কতটুকু ও কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছে বা মূল্যায়ন করা হয় তা কি কখনও ভেবে দেখেছি আমরা! ধরে নিচ্ছি, কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা আমাদের জাতীয় দায়িত্বের পর্যায়ভুক্ত। যেহেতু তিনি জাতীয় কবি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ?

ইতিপূর্বে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে আমি আমাদের জাতীয় কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছি। অনেকেই এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। এটি অনস্বীকার্য যে, বাংলা সাহিত্যের সত্যিকার উত্তরণ, ভিত্তিস্থাপন ঘটেছে মধুসূদনের হাতেই। তাঁর সাহিত্যেই প্রথম প্রতিফলিত হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রধ্বনি। একটি জাতির সত্যিকার পরিচয় তার সাহিত্য-সংস্কৃতির ভেতর নিহিত। আজ আমরা একটি উজ্জ্বলতম সাহিত্য-সংস্কৃতি, ভাষার উত্তরাধিকার; তার যোগ্য পূর্বসূরী মধুসূদন। মহাকবির আবির্ভাব যদি আমাদের সাহিত্যে না ঘটত, তবে আমাদের উত্তরণ এখনও কয়েক যুগ পিছিয়ে থাকত। আজ আমরা বাঙ্গালী বলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি, তার কৃতিত্ব মধুসূদনের কম নয়। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি গভীর দেশপ্রেম, স্বাজাত্যবোধের উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি সর্বপ্রথম কবি যিনি ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিবাদে তাঁর সম্পাদিত মাদ্রাজ সার্কুলেটর পত্রিকায় ‘মুসলমানস ইন ইন্ডিয়া’ উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিলেন। তিনিই একমাত্র কবি যিনি সর্বপ্রথম প্রচণ্ড বিদ্রোহ করেছেন জাতিভেদের বিরুদ্ধে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও স্বদেশ, স্বজাতির জন্য গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। সেই কবিকে আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করে থাকি? আমার একান্ত বিশ্বাস বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো কবি, সাহিত্যিক, বুদ্বিজীবী নেই যে, মধুসূদনের কাছে ঋণী নন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মানবতাবাদী কবি মধুসূদনকে অস্বীকার করার অর্থ আমাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। অথচ এদেশে সেটিই ঘটছে। এ দেশে দুবার এশীয় কবিতা উৎসব উদ্যাপিত হয়েছে, উৎসব শুরুতে এশিয়ার প্রয়াত বিভিন্ন কবির নান্দীপাঠ করা হয়েছে। সেখানে মধুসূদন নেই। মঞ্চে শোভা পেয়েছে অসংখ্য কবির ছবি, যেখানে মধুসূদন অনুপস্থিত। জাতীয় কবিতা উৎসবও একই অভিযোগে অভিযুক্ত হবে। কিন্তু বাংলা ভাষা সাহিত্যের প্রসঙ্গ এলেই সেখানে মধুসূদন দত্তের প্রসঙ্গ আসতে বাধ্য। মাত্র চার বছর বাংলা ভাষায় সাহিত্য-সাধনা করে মহাকবি যে অমূল্য সম্পদে আমাদের ঐতিহ্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন; তারই যোগ, বিয়োগ, কর্ষণ, উৎকর্ষণে আমরা একটি উন্নত ভাষা-সাহিত্যের ধারক-বাহক। তাই মধুসূদনকে মূল্যায়ন করা হোক। জাতীয় পর্যায়ে তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নজরুল চেয়ারের মতো মধুসূদন চেয়ার প্রতিষ্ঠা করে মধুসূদন অধ্যাপক পদ প্রবর্তন করা হোক। মহাকবির নামে ভবন, এভিনিউ, সড়কের নামকরণ করে আমাদের লজ্জাকে অপনোদন করার সময় এসেছে এখন। মধুসূদন দত্তের স্মৃতির সংরক্ষণ, যথাযথ মূল্যায়ন, তথা গবেষণার লক্ষ্যে এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধুসূদন একাডেমী। এই প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমি এদেশের শিক্ষিত শ্রেণী, বুদ্ধিজীবী তথা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি বিশেষ আবেদন রাখব।

আর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশি মাতামাতি আমাদের ক্ষতির দিকটাকে প্রশস্ত করবে। আমাদের জানা উচিত রবীন্দ্রনাথ প্রায় চার যুগের বেশি সময় ধরে সাহিত্য সাধনার সুযোগ পেয়েছিলেন। এজন্য তাঁর সৃষ্টির সাফল্য এত দিগন্তবিস্তারী। রবীন্দ্রনাথের মতো কবি শুধুমাত্র কি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন বলেই তাঁকে এত মূল্যায়ন করা হয়? রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশি মাতামাতি আমাদের অতীন্দ্রিয়বাদিতা, ভাববাদীতার লক্ষণকেই স্পষ্ট করে তুলবে। তাঁর সৃষ্টিকে আমরা সম্মান জানাব। তাঁর সৃষ্টি আমাদের মূল্যবান সম্পদ, এই বক্তব্যে বিশ্বাস রেখেই যেটুকু করণীয় তার অধিক কিছু করাটা সমীচীন হবে না। কিছুদিন আগে সংবাদ-এর পাতায় জনৈক সক্রেটারী মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলা ভাষাভাষী সকল সম্প্রদায়ের যদি কেউ নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিতে চায়, তাঁকেও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের একনিষ্ঠ অনুসারী হতে হবেÑ বিকল্প নেই।’ এই দুই কবিকে মহাপুরুষ আখ্যা দিয়ে তাঁদের কবিতাকে ‘খোদার ওহী’ বলতেও কসুর করেননি তিনি।

কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের মূল্যবান সম্পদ। তাঁকে আমাদের রক্ষা করা উচিত। তার অর্থ এই নয় যে, তাঁকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী, সম্প্রদায়ের করে তোলা। এদেশের নজরুল গবেষকরা কতটুকু দায়িত্ববান তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। কিন্তু জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথের কেন? জাতীয় প্রেরণা উদ্দীপক নজরুলের কোনো সংগীত কি নেই? সত্যিকার নজরুলকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।”

চিঠিটা ছিল এরকম। এ চিঠি সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হলে শুরু হয় তুমুল প্রতিবাদ। চব্বিশ জুলাই থেকে মাসাধিক সময় ধরে সংশ্লিষ্ট পত্রিকায় চলতে থাকে আমাকে আক্রমণ করে প্রচুর লেখা। আমার ঠিকানায় আসতে থাকে গালিগালাজ করে লেখা অসংখ্য চিঠি। এমনও দিন গেছে পত্রিকার চিঠিপত্র বিভাগে প্রতিবাদ ছাড়া আর কিছুই ছাপা হয়নি। সাগরদাঁড়ীতে এসে কিছু লোক আমাকে খুঁজেও গেছে। সিলেট থেকে শ্রদ্ধাভাজন কবি দিলওয়ার চিঠি লিখে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন; সেটি সত্য হল।

তখন প্রখ্যাত সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত ছিলেন দৈনিক সংবাদ-এর সহকারি সম্পাদক। তিনি জুলাই মাসের সাতাশ তারিখে ‘অনিরুদ্ধ’ ছদ্মনামে লেখেন উপসম্পাদকীয়। ‘দেখতে যদি চাওÑ সরে এসো ছায়ায়’ শিরোনামে তিনি লেখেন: “সাগরদাঁড়ীস্থ মধুসূদন একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক খসরু পারভেজ একটি চিঠি দিয়েছেন। তাতে তিনি রবীন্দ্র-নজরুল নিয়ে অন্তহীন আলোচনা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং মাইকেল মধুসূদন সম্পর্কে স্বীয় মূল্যায়ন খুবই সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন। চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের গান কেন জাতীয় সংগীত করা হল, এ প্রশ্নও তুলেছেন। তাঁর এ ধরনের চিঠি কেন প্রকাশ করা হল, এ নিয়ে ক্ষোভ এবং সম্ভবতঃ বিস্ময় প্রকাশ করে কেউ কেউ অফিসে টেলিফোন করেছিলেন বলে শুনেছি। এদিকে তাঁর চিঠি পড়ে বেশ কিছু পাঠক চিঠি দিয়েছেন। ছাপাও হয়েছে।

আসলে খসরু পারভেজ রবীন্দ্র বিতর্ক তুলেছেন কিংবা বলা চলে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমাদের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। খসরু পারভেজের রবীন্দ্রবিরোধিতার সুরের সঙ্গে দেশবাসী পরিচিত। তারপর, তাঁর যুক্তির জবাবও অনেকে দিয়েছেন। সুতরাং সে প্রশ্ন এখানে আনছি না।

খসরু সাহেবের চিঠি কেন ছাপা হল। কারণ, রবীন্দ্রবিরোধিতার যে ধারার সঙ্গে আমরা পরিচিত, তাতে তিনি নতুন কিছু যোগ করেননি। রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া, রবীন্দ্রনাথ জমিদারÑ এ অভিযোগ খসরু সাহেবের একার নয়। আমরা এ ধরনের অভিযোগ নতুন তাঁর মুখে শুনছি না। সুতরাং এ ধরনের চিঠি ছাপিয়ে বিতর্ককে উস্কে দেয়া কোন প্রয়োজন সিদ্ধি করবে? না, রবীন্দ্র বিতর্ক চলবে। তবে তা চিঠিপত্র কলামে এনে কোন প্রয়োজন সিদ্ধি কোন পক্ষেরই হয়তো হবে না। এ রকম মনে হতে পারে। আর সেটা অনুমানসাপেক্ষ। কিন্তু যে কারণে চিঠিটি মূল্যবান, তা হল খসরু পারভেজ মধুসূদন একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক। একটি প্রতিষ্ঠান যার গুরুত্ব রয়েছে, সেখানে এরকম মানসিকতার একটি লোক কীভাবে দায়িত্ব নিয়ে বসে আছেন। তিনি কতটা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং বিশেষভাবে মধুসূদনকে মূল্যায়ন করবেন তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে।

রবীন্দ্র বিতর্ক একটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় এদেশে। এটা আজকে থেকে নয়, পাকিস্তান আমল থেকে। আর এই বিতর্কের স্বরূপ কিন্তু এক নয়। সে কথাটা আমরা ভুলে যাই। খসরু সাহেব মধুসূদনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন, আর হাতিয়ার করেছেন নজরুলকে। তাতে চমক আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু রবীন্দ্র বিতর্ক কেন সময় সময় দেখা দেয় এবং তার স্বরূপ কি এটা বোঝা দরকার। শুধু পাকিস্তানী বিকৃত আদর্শের ধারক-বাহকরা রবীন্দ্রনাথকে ভিন্ন চোখে দেখছেÑ একথা মানতে পারলে, ব্যাপারটা সহজ হত। আমরা যেভাবে রবীন্দ্রনাথ মূল্যায়ন করি সেখানে রবীন্দ্র বিতর্কের নামে তার বিরোধিতার বহুরূপী সাজ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার প্রয়োজন আছে। যারা এটা স্বীকার করতে নারাজ তারা ভাবছেন খসরু পারভেজের মত এক ব্যক্তির রবীন্দ্রবিরোধিতাকে এত মূল্য দেয়া হল কেন? কারণ, এদের ভাবনায় (আমার অনুমান মাত্র) এ রকম এক ব্যক্তির লঘু বক্তব্যকে মূল্য দিয়ে তাঁকে পাদ-প্রদীপের সামনে এনে দেয়া হয়েছে। এ অপবাদ মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু চিঠি ছাপিয়ে প্রগতি শিবিরের ক্ষতি করেছি এমনটা অপবাদ নয়, সংকীর্ণ চিন্তার বিস্তার মাত্র।

রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তি সম্পর্কে খসরু পারভেজ কটাক্ষ করেছেন। প্রতিবাদে সে কথাও উল্লেখ করেছেন কোন কোন পাঠক। এটা নিশ্চয়ই অনেকে জানেন যে, রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তি নিয়ে এমন মন্তব্য করা হয়েছিল এক সময় যে, ইউরোপ আমেরিকার বুর্জোয়া দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং তৎকালে ওই সব দেশে বাম আন্দোলন প্রবল হওয়ার মুখে যখন আধ্যাত্মবাদীরা একটু বেকায়দায় পড়লেন, তখন প্রাচ্যের এই মরমী কবির ভক্তি রসপূর্ণ কাব্যগ্রন্থখানিকে নোবেল প্রাইজ দিয়ে বেসামাল অবস্থা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেছে মাত্র।

খসরু পারভেজ স্থূলভাবে এনেছেন, কারণ এখন এ দেশে সংস্কৃতির অঙ্গনে ধর্মকে আসন দেয়ার নামে সংস্কৃতিকে পোষ মানানোর ব্যবস্থা পাকা করার চেষ্টা চলছে। এটাকে বৌদ্বিক মার্গের লেখক যেমন নীরদচন্দ্র চৌধুরী বলেছেন, নোবেল প্রাইজ পাওয়াটাকে সত্যকার লাভ বলে গণ্য করা বোকামি। কারণ তাঁর মতে এই পুরস্কার ‘সত্য লাভ মোটেই নয়, উহা সম্পূর্ণ অলীক, কল্পিত লাভ। তাঁহার ধারণা যে একান্তভাবে ভ্রান্ত রবীন্দ্রনাথ তাহা বুঝিতে পারেন নাই। পশ্চিমের যে দেবতা তাকে গ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনি সাহিত্যের দেবতা নন। আসলে তিনি ফ্যাশানের দেবতা। নোবেল প্রাইজ তাঁহাকে যে কারণেই দেওয়া হউক, সাহিত্যিক কীর্তির জন্য দেওয়া হয় নাই, এই সোজা কথাটা রবীন্দ্রনাথ কেন যে উপলব্ধি করেন নাই তাহা আমি এখনও বুঝিতে পারি না।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ যে ইংরেজি বইয়ের জোরে পুরস্কারটা পাইয়াছিলেন সেটিকে বই না বলিয়া পুস্তিকা বলা উচিত। আর যে ইংরেজিতে বইখানা লিখিয়াছিলেন উহা স্বাভাবিক ইংরেজি নয়, খেয়াল, শখ বা খেলার ইংরেজি মাত্র। এতটুকু একখানা বই বা এই ধরনের ভাষার জোরে যে কাহারও স্থায়ী সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা হইতে পারে না, ইহা রবীন্দ্রনাথ হিসাব করিয়া দেখেন নাই। তিনি ধারণা করিয়া বলিলেন যে, তাঁহার সাহিত্য সাধনার সার্থকতা পাশ্চাত্যে হইয়াছে।’

রবীন্দ্র মূল্যায়নে নীরদ চৌধুরী এখানেই থামেন নাই। তিনি বলেন, ‘অভিনেতা হিসেবে বিশ্বের দরবারে লেডিড্রেস পরিয়া থাকার ফলে জীবনে ব্যর্থতা ভিন্ন পূর্ণতা আসে নাই।’ আমরা কখনো এ ধরনের লেখায় মনোযোগ দেই। এসব থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে আনার দিকে ঝোঁক এ দেশে শুরু হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে। রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক শক্তির পুনর্বাসনের কালপর্বের সঙ্গে মিলটা বেশি। মধুসূদনে আড় দিয়ে তা ঢাকা পড়ে না।

কিন্তু এজন্য একা খসরু সাহেবরা দায়ী নন। রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া ও জমিদার ছিলেন এই চিন্তায় এদেশের বাম বুদ্ধিজীবীদের একাংশ একথা শুধু বলেন না, ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েন তৃতীয় প্রজন্ম তাঁর কাছ থেকে কী পাবে। এখানেই তাঁরা থামেন না। মুসলিম সমাজ নিয়ে তাঁর লেখা নেই বলে আপসোস করেন। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্টদের রবীন্দ্র মূল্যায়নের থেকে মৌলিকভাবে কেউ সরে আসেননি। এর গোড়াপত্তন সেদিন হয়েছিল ভাবলে ভুল করা হবে। মার্কসবাদী রবীন্দ্র বিচার সম্পর্কে কবি বিষ্ণু দে এক প্রবন্ধে মন্তব্য করেছিলেন, ‘নিকৃষ্ট মার্কসবাদীরা আবার আলোচনায় নেমে, কটুকাব্য গালি-গালাজকে ভাবেন ডায়লেকটিক্স, বাক্যের অপব্যখ্যা করেন, প্রতিপক্ষকে অসম্পূর্ণভাবে বা মিথ্যাভাবেই উদ্ধৃত করেন। বোধের ও জ্ঞানের অভাবকে ঢাকেন অন্ধের আত্মম্ভরিতায়। তবু এই শিকড়ের অন্বেষার চর্চায় সাহিত্যিক লাভ হবে শেষ পর্যন্ত এ আশা কি করা যায় না? তখন হয়তো আর রবীন্দ্রনাথের সমস্ত কাব্য এবং তাঁর সমগ্র কবিস্বভাব বাদ দিয়ে তাঁর গদ্য মতামতের থেকে ইচ্ছামত উদ্ধৃতি দিয়ে মার্কসবাদীরা প্রমাণ করতে যাবেন না তিনি কতখানি সাম্প্রদায়িক বা কতখানি ইংরেজভক্তÑ বা অন্য পক্ষে, সাম্যবাদের প্রায় পুরোধা। রবীন্দ্রনাথের বিরাট রচনাবলী থেকে অবশ্য সবরকম মতবাদেরই সমর্থন কমবেশি বার করা যায়। কিন্তু সমস্ত কবিসত্তাই কবি বিচারে মূল বিবেচ্য, কবিজনোচিত স্বভাবগুণে কবিদের মতবাদ প্রায়ই অস্পষ্ট থাকে, আরো আমাদের উনিশ-বিশ শতকের সমাজের অস্পষ্ট গোঁজামিল অবস্থার জন্যে।’ (রবীন্দ্রনাথ, না রবীন্দ্রনাথ)।

এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মতটা শোনা যাক। তিনি বলেছেন, ‘আমার মত এই যে আমরা অর্থনীতি বা ধর্মনীতিতে যে দলেরই লোক হই আমাদের সেই দলাদলি সাহিত্যকে বিশেষ মতের ছাঁচে গড়ে তুলবেই এমন কথা নেই। প্রাণতত্ত্বে বলে দেহে সাময়িক অভ্যাসজনিত যে বিশেষত্ব জন্মে তা বংশের মধ্যে সঞ্চারিত হয় না। বাইরের অভ্যাস যত প্রবল হোক আয়ুর সীমায় এসে তা লুপ্ত হয়। সাহিত্যেও তাই। রসের দিক থেকে মানুষের ভাল-মন্দ লাগা কোন বাহ্য মতকে মানতে বাধ্য নয়। কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধ ব্যাপারের মাঝখানে সমস্ত ভগবদগীতা ভিত গেড়ে বসে আছে, কিন্তু মহাভারতের কাব্যকে স্পর্শও করতে পারেনি। ভীষ্মের মৃত্যু ঘটনার মধ্যে যে মহিমা যে কারুণ্য আছে, সমস্ত শান্তিপর্ব আপন মহোচ্চ উপদেশের বোঝা নিয়ে তাকে টেনে নিয়ে যায়নি। ধর্মকর্ম সম্বন্ধে কবির যে মতই থাক, ভীষ্মবধের বিবরণে তার দৃষ্টান্ত খুঁজতে যাওয়া মূঢ়তা। কৃষ্ণের পরামর্শের কুটিলতা এবং পাণ্ডবের পক্ষে যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধাচরণ কাব্যের রসকে এত তীব্র করে তুলেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত এই নীতিবিকার দেখা যায়। উপদেশ হিসেবে, মত হিসেবে একে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু কাব্যের রস হিসেবে এ মহার্ঘ্য। কবির কল্পনা এবং কবির মতের একজোট হবার দরকার নেই। শালের কাঠ ও শালের মঞ্জুরির প্রকাশ স্বতন্ত্র। মার্কসবাদের ছোঁয়াচ যদি কাব্যে কবিতায় অর্থাৎ কাব্যের জাত বাঁচিয়ে লাগে, তাহলে আপত্তির কথা নেই, যদি নাই লাগে তাহলে কি জাত তুলে গাল দেয়া শোভা পায়? কেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরি যদি ভালোয় ভালোয় জুড়তে পারো রান্নাঘরে তবে সায়েন্সের জয়জয়কার করব, কিন্তু নাই যদি পারো তাহলে হার-জিতের তর্ক তুলব না, ভোজনটার ব্যাঘাত না হলেই হল।’

তাই খসরু পারভেজের সঙ্গে মার্কসবাদীদের অমিল এখানেই, সে জাতপাতের কথা তুলেছে যেটা সামাজিক, আর বামপন্থীরা তুলেছে সেটা রাজনৈতিক, ফলাফল একই। তাই তার লেখায় ক্ষুব্ধ হব। কিন্তু গাল দেয়ার ভারটা আমরা নেব, এমন আবদার চলতে পারে না। তাই শুরুতেই বলেছি খসরু পারভেজের বক্তব্যের জবাব এটা নয়, কিন্তু এই প্রসঙ্গে আমাদের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

খসরু পারভেজের জবাব যারা দিয়েছেন, তারা যথাযথ যুক্তি দিয়ে তাঁর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে নিরাভরণ করেছেন। কিন্তু যে রবীন্দ্রবিরোধিতা পাকিস্তান আমলে প্রত্যক্ষ করেছি, তার নায়করা তো আমাদের সারিতে আছেন, আর সেই জোরে এখন আমরা তাঁকে (রবীন্দ্রনাথকে) ডান দিক থেকে আক্রমণের পরিবর্তে বাম দিক থেকে আক্রমণের পরিবর্তে বাম দিক থেকে চেপে ধরেছি। তাঁর জনগণমন নামক সংগীতের উৎস নিয়ে ভুল ও মিথ্যা বিচার তো বামপন্থীরা (একাংশ) করেছেন অকাট্য তথ্য-প্রমাণ একাধিকবার দাখিল করার পরও। তাঁদের ভরসায় যদি খসরু সাহেব তাঁকে সম্রাটসর্বস্ব বলেন, তবে রাগটা তাঁর ওপর থেকে নিজের ওপর হওয়া কি সঠিক নয়?

‘বুর্জোয়া ও জমিদার’ রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করেছেন রবীন্দ্র গুপ্ত (ওরফে ভবানী সেন) প্রমথ চৌধুরীর রায়তের কথা’র রবীন্দ্রনাথের ভূমিকার সমালোচনা করে। তিনি বললেন, ‘গরীব কৃষককে কুলাকের ভয় দেখিয়ে রবীন্দ্রনাথ জমিদারী প্রথা সমর্থন করেছেন। টলষ্টয় অজ্ঞ কৃষকÑ গণতন্ত্র বা ইউরোপিয়ান সোশ্যালিজম-এর ভক্ত ছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সামাজিক গণতন্ত্রের বিরোধী।’ যুক্তি দেয়া চলে বিবেচক কমিউনিস্টরা এ ধরনের মূল্যায়ন থেকে পরে সরে এসেছেন। এই সরে আসাটার মূলে কাজ করেছে মূলতঃ দেশের মানুষের সামাজিক চেতনা এবং অপেক্ষাকৃত বিবেচক মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা। কিন্তু তাঁরা মূল বক্তব্য থেকে খুব একটা বিচ্যুত হয়েছে এমন মনে করা ভুল। রবীন্দ্র শতবার্ষিকীতে ‘রবীন্দ্রনাথ’ (গোপাল হালদার সম্পাদিত) গ্রন্থে ‘সার্বভৌম কবি’ প্রবন্ধে হীরেন মুখার্জি লিখলেন, ‘বারবার ব্যাপ্তির কথা বলতে গিয়ে একটু থমকে ভাবতে হচ্ছে যে, কাব্যরাজ্যে পরিসর তো মহত্তম বস্তু নয়, মানসিক ঐশ্বর্যের সঙ্গে সঙ্গে অনুভূতির তীব্রতা ও গভীরতা বিনা তো কাব্যের কৈলাসে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না। মহাকাশে সংখ্যাহীন গ্রহ-নক্ষত্র বিলীন হয়ে গেলেও প্রকৃতির হানি হয় না। কিন্তু সূর্যের দিকে তাকিয়ে ঘাসের যে প্রতিটি ডগা, রোজ হেসে ওঠে সেখানে প্রকৃতির অসীম হৃদয়ের সকল যত্ন এবং কৌশল অবস্থিত না থাকলে তো চলে না। এই তীব্রতা ও গভীরতার দিক থেকে বিচার করলে রবীন্দ্রনাথকে একেবারে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা মুষ্টিমেয় কয়েকজন কবির সারিতে না বসিয়ে, কিন্তু একটু নামিয়ে জায়গা দেয়াই হয় তো সমীচীন।’

তথাকথিত অভ্রান্ত প্রায় ধর্মতুল্য মার্কসীয় বিচারের রীতিই এই। এটাকেই তাঁরা দ্বান্দ্বিক বলে চালিয়ে থাকেন। সেখানে খসরু পারভেজ সরাসরি লগুড় হাতে আসরে অবতীর্ণ হয়েছেন। এই পার্থক্যকে স্বীকার করব।

তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ বিতর্ক উঠলেই ক্ষুব্ধ হতে হবে, সেটা বলছি না। মহৎ সৃষ্টি আজীবন বিতর্কিত। কিন্তু লক্ষ্য উত্তরণ। কাউকে টেনে নামিয়ে নিজের অপবুদ্ধির গর্বে গদগদ হয়ে উঠা নয়। সাহিত্যের শ্রেণীবিচার ও ধর্মীয় বিচারে পার্থক্য নেই। তাই সেদিন যাকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়, তাকে ফিরিয়ে নেয়ার গরজ নতুন করে দেখা দেয়। এটাকে শুধু মতবাদের জোয়ার-ভাটা দেখিয়ে খারিজ করা চলে না, চলছে না। তা সোভিয়েত ইউনিয়নে নির্বাসিত লেখকদের নিয়ে আলোচনা, স্বদেশ সফরে আসা ইত্যাদি ঘটনাই সাক্ষ্য।

রবীন্দ্রবিরোধিতার একটা মার্জিত শোভন চমক লাগানো উদ্ধৃতি দিয়ে আমার কথা শেষ করতে চাই। ‘ইউরোপ বাংলা কবিতায় এসেছে বিষ্ণু দে-র উল্লেখে, জীবনানন্দে এসেছে চিন্তায় ও রূপে। একটা কথা ভেবেছ?Ñ সেই রবীন্দ্রনাথ, শেলী, কীটস, বায়রণ গুলে খেয়েও ঔপনিষদিক রয়ে গেলেন। তাঁকে কিন্তু ইংরেজী ধনংঃৎধপঃরড়হ একটুও স্পর্শ করল না কেন?র্ ুীষশ ড়ফপ ঃড় ধহ ওহফরধহ রিহফ মনে করোÑ ‘ধহ ওহফরধহ রিহফ’ রবীন্দ্রনাথে কোথাও ছিল না। বাংলা কবিতা গড়ে উঠেছে অনেকটা ছেলেমানুষী জাম্প-কাট সিস্টেমে।’ (রবীন্দ্রনাথ, নাÑ রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণেন্দু পত্রী সম্পাদিত)।

পণ্ডিত ও প্রবন্ধকার শিবনারায়ণ রায় রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করে একস্থানে বলেছিলেন, ‘জীবনকে সমগ্রভাবে স্বীকার করতে না শিখলে আর যাই হওয়া সম্ভব হোক, প্রথম শ্রেণীর সাহিত্যিক হওয়া অসম্ভব। ভাষার ওপর তাঁর যতই দখল থাক, ভাবনা তাঁর যতই মহৎ হোক, এই একই জায়গায় ঘাটতি হলে কোন কিছুর জোরেই তা পূরণ করা চলে না। রবীন্দ্রনাথও পারেননি।’

খসরু সাহেব তাঁর নিজস্ব বিধানে সেই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। একথা বলার অর্থ খসরু সাহেবরা নানারূপে আমাদের সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে আছেন। তাঁরা ছদ্মবেশ ধরেছেন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর। একটু একটু করে বেরিয়ে আসছে। তাকে চাপা দিয়ে, কিংবা চোখ ফিরিয়ে থেকে বাঁচা যায় না। সুতরাং তাঁদের আত্মপ্রকাশের গরজকে ক্ষতিকর না মনে করে, তাঁদর ভূমিকার ক্ষতিটার প্রতি চোখ ফেরাতে হবে।

আসল কথাটা হল, যে দেশে রবীন্দ্রচর্চার মানে করা হয় রবীন্দ্রবিরোধিতার ও বিতর্কের ডালি খুলে রসদ বের করে আর তার মূল্যায়নকে বিশ্লেষণমূলক লেখার ওপর স্থান দিয়ে দলাদলির পাল্লাটার প্রতি নজর রাখা হয়। সেখানে কাঁচা বুদ্ধির মূলে ঘূণ ধরাটাই স্বাভাবিক।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এবার ঝড় উঠেছে সরকারী পর্যায়ে তাঁকে আপন কার্যসিদ্ধির ব্যবহারে। দু’পক্ষই উত্তপ্ত। একজনের আশংকা নানাভাবে রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের দু’বিঘা জমি থেকে বিশ্বখাতায় নাম লিখিয়ে ঊর্ধ্বলোকে নির্বাসনের ব্যবস্থাটা সরকার কাঁচা চালে ভণ্ডুল করে দিল। অপর পক্ষ ভাবলো যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে দলাদলিতে আর একটা রসনা বাড়লো। তাই বলি, এ থেকে মুক্তি হোক মননের। দেখতে যদি চাও, সরে এসো ছায়ায়। কারণ ‘দিন সে প্রাচীন অতি প্রবীণ বিষয়ী/তীক্ষè দৃষ্টি বস্তুরাজজয়ী।’ কোন স্বার্থকে আঁকড়ে ধরে রবীন্দ্র-নজরুল-মধুসূদন এক কথায় শিল্পী-সাহিত্যিকদের মূল্যায়ন সম্ভব নয়।”

এই উপসম্পাদকীয় প্রকাশের পরও পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হতে থাকে প্রতিবাদ ও নিন্দামুখর চিঠিপত্র। একপর্যায়ে দৈনিক সংবাদ কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেন, যে “খসরু পারভেজের রবীন্দ্রনাথ বিতর্ক বিষয়ক চিঠিপত্র আর প্রকাশ করা হবে না।”

‘অনিরুদ্ধ’ আমার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমার উদ্দেশ্য ও মানসিকতার যে স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করেছিলেন, সেখানে আমার অবস্থান কোথায় নিজেকে নিয়ে সে বিচার আমি করবো না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমার লেখাটি ছিল নিতান্ত বালসুলভ। লেখাটি ছেপে সংবাদ কর্তৃপক্ষও খুব দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন বলে মনে হয়নি। যদিও এটি ছাপার কারণ সম্পর্কে উপসম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, সংবাদের মতো প্রগতিপন্থী একটি পত্রিকাও চায় এ ধরনের বিতর্ক জিইয়ে রাখতে। যার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হয়।

আলোচনার শুরুতে বলেছিলাম, ছাত্রজীবন থেকে একটি রবীন্দ্রবিরোধী চেতনা গড়ে ওঠে ভেতরে ভেতরে। নিজের ভ্রান্তিকে যখন অপনোদন করতে চাইছি, তখন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ‘দৈনিক ভোর’ পত্রিকায় ধারাবাহিক যে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটিও উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি। এ পত্রিকায় আমি লিখেছিলাম “জনগণনন্দিত ও নিন্দিত রবীন্দ্রনাথ”। যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। সেই প্রবন্ধের সবটুকু উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যেটুকু পেয়েছি তা এরকম, “কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের বঙ্গজ চেতনার সার্থক নায়ক। আমাদের অস্তিত্ব এবং রবীন্দ্রনাথ এক আজন্ম অহংকারের গণ্ডিতে আবদ্ধ। প্রতিবছর এই ক্ষণজন্মা মনীষীকে তাঁর জন্মতারিখ থেকে পরবর্তী বছর পর্যন্ত বিভিন্নভাবে আমরা তাঁকে স্মরণ করে থাকি। তাঁর জন্মদিন ও মৃত্যুদিন মিলিয়ে বলা যায়, সমস্ত বছরটাই আমরা রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি ভক্ষণ করে আমাদের মনের উদর পূর্তি করি। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য বিষয়-বৈচিত্র্যে, অনুভবের গভীরতায়, বোধের ব্যাপকতায়, কলেবরের বিশালতায়, ভঙ্গির বহুবিধ বিকাশে অনন্য একথা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে আমরা যতটুকু প্রয়োজনে ও সচেতনভাবে স্মরণ করে থাকি, তার চেয়ে বেশি বরণ করি অহেতুক আবেগে।

এক বুর্জোয়া এবং সামন্ত যুগের সন্ধিক্ষণে রবীন্দ্রনাথের জন্ম। জমিদারী পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। ঠাকুর বাড়ির লোকজনদের যোগাযোগ ছিল আধুনিক ইউরোপের সঙ্গে। পাশ্চাত্য চেতনার প্রভাব রবীন্দ্রমানসকে খুব সহজেই প্রভাবিত করেছিল। একইসঙ্গে একটি ভাবজগতের কল্পনালোকে লালিত হয়েছে তাঁর চেতনা। পরিবারে ছিল ব্রাহ্মধর্মের ভক্তিরসের শক্ত অবস্থান। যার কারণে মাটি-মানুষের সংস্রবের চেয়ে ভক্তিরসে জারিত হয়েছে তাঁর মনন।

তিনি মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন, সে উচ্চারণ উচ্চকিত নয়। ব্রিটিশপীড়িত ভারতের দুঃখ-দুর্দশার ছিঁটে-ফোঁটা তাঁর সাহিত্যে আমরা লক্ষ্য করি। রবীন্দ্রসাহিত্যে উদারতম মানবিকতার যে ধারাটুকু হৃদয়গ্রাহ্য, তা তত্ত্ব হিসেবে উচ্চারিত।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শোষণের দুঃসহ দিনগুলোতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো একজন কবির পক্ষে যতখানি প্রতিবাদী ভূমিকা রাখার প্রয়োজন ছিল, ভারতবাসী তা প্রত্যক্ষ করেনি। আর রবীন্দ্রনাথ যদি জনগণের কাতারে নেমে এসে প্রতিবাদী হতেন, তাহলে তাঁর ভাগ্যে নোবেল প্রাইজ জুটতো কিনা সন্দেহ জাগে। বিলেত ছিল ঠাকুর পরিবারের বিচরণ ভূমি। তার ক্ষেত্র পিতামহ অনেক আগেই তৈরি করে রেখেছিলেন। পূর্বপুরুষের পদধন্য বিলেতে নিজেকে পরিচিত করাতে রবীন্দ্রনাথের খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। তিনি যখন বিলেত পৌঁছান, সেখানে পূর্ব নির্ধারিত কবির পৃষ্ঠপোষক রদেন স্টাইন কালবিলম্ব না করেই পরিচিতি বৈঠকের আয়োজন করেন। এ বৈঠকে আমন্ত্রিত ছিলেন এজরা পাউন্ড, এইচ জী ওয়েলস, রবার্ট ব্রিজেস, অ্যান্ড্রুজ প্রমুখ লেখক, পণ্ডিত। গীতাঞ্জলি কব্যের পাঠ শুনে মুগ্ধ হলেন অনেকে। অতঃপর ইয়েটসের কাছে এর ভূমিকা লেখার দায়িত্ব অর্পিত হল। প্রশংসা করলেন এজরা পাউন্ড। আর অ্যান্ড্রুজ সাহেব গীতাঞ্জলির গীতময়তায় এতখানি মুগ্ধ হলেন যে, তিনি ভারতবর্ষে এসে কবির সেবায় আজীবন কাটিয়ে দেবেন, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেললেন। জানা যায়, সেবার রবীন্দ্রনাথের বিলেত সফর ছিল মূলত তাঁর অর্শ রোগের চিকিৎসা করানো। নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির ভিত্তি তখনই রচিত হয়েছিল। রবীন্দ্র সমালোচক নারায়ণ চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, ‘রবীন্দ্র কাব্যের অতীন্দ্রিয়তুরীয়তায় পাশ্চাত্য ভাবুকদের মুগ্ধ হবার সবিশেষ কারণ ছিল। পাশ্চাত্য সভ্যতায় মজ্জাগত হিংসার হানাহানি, অতিরিক্ত বস্তুবাদের পীড়ন, ইউরোপ খণ্ডের সর্বত্র অশান্তি ও উপদ্রবের বাতাবরণ যুদ্ধের ভীতি, ভিতরে ভিতরে ইংল্যান্ডের কবি-মনীষী ভাবুকদের ক্লান্ত করে তুলছিল এবং তারই প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রকাব্যের মিস্টিক মাধুর্য ও শান্তরস এবং বাইবেলীয় স্তোত্রসদৃশ্য গীতাঞ্জলির গান তাঁদের মনে একটা অভূতপূর্ব বৈরাগ্যভাবের সঞ্চার করে তাঁদের চিত্তকে সাময়িকভাবে অন্তত বাস্তব সংসারের জাগ্রত চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই জমায়েতের মধ্যে একজন ছিলেন যিনি রবীন্দ্রনাথের এই শান্তরসাম্পদ আধ্যাত্নিক ও ভক্তিমার্গীয় কাব্যের কুহকে এতটুকু মজেননি। তিনি প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক এইচ জি ওয়েলস। ওয়েলসের বিজ্ঞান-প্রীতি সুবিদিত। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা প্রসূত এই সুখীনতা ও বুদ্ধিবাদের কর্ষণায় তাঁর মন এতই সত্য-সংলগ্ন ছিল যে, গীতাঞ্জলির নির্বেদ ও ভক্তিভাব তাঁর মন আকৃষ্ট করতে পারেনি, তিনি বৈঠক থেকে সম্পূর্ণ অপ্রভাবিত ও অপ্রস্তুত অবস্থায় বেরিয়ে এসেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি পরে রবীন্দ্র ব্যক্তিত্বের প্রতি তাঁর বিরাগ প্রকাশ্যে ঘোষণা করতেও ছাড়েননি। কেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতি ওয়েলসের এই বিমুখতা? সেকি এই জন্য নয় যে, দুইয়ের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির মূলগত অনৈক্য বিদ্যমান। একজন সাধনাতীতভাবে অতীন্দ্রিয়চারী আকাশবিহারী স্বপ্নের দুলাল ভাববাদী কবি, অন্যজন একান্তরূপে যুক্তির ধরণীতে চলতে অভ্যস্ত, বস্তুতন্ত্র আসক্ত বিজ্ঞান চেতনায় ভরপুর মর্ত্য ও মনুষ্যপ্রেমী পদ্য লেখক? এখানে রবীন্দ্রনাথ বড় কি ওয়েলস বড় সে প্রশ্ন আদৌ ওঠে না, বস্তুতঃ নবনবোম্মেষশালিনী প্রতিভার বৈচিত্র্যের অধিকারী অপরূপ নির্মাণক্ষম স্রষ্টা ব্যক্তিত্ব হিসেবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওয়েলসের কোন তুলনাই হয় নাÑ সৃষ্টিশীলতায় ওয়েলস নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে অনেক নীচের ধাপে অবস্থিত। কিন্তু সৃষ্টিশীলতার তুলনামূলক তারতম্য বিচারের প্রশ্ন এ নয়, এ হলো কীভাবে জীবন-জগৎ ও মানুষকে দেখেন তার প্রশ্ন। এই মানদণ্ডে ওয়েলস পৃথিবীর অগণিত মানুষকে তাঁর চলার পথের সঙ্গী ও সমর্থক হিসাবে পাবেন। পক্ষান্তরে এই ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের জগৎ একান্তভাবেই সংখ্যালঘুর জগৎ। রবীন্দ্রনাথের আত্যন্তিক অতীন্দ্রিয়চারিতা মরমীবাদের কুয়াশা, কল্পনার আতিশয্য ও গণজীবনের সুখ-দুঃখের প্রতি ঔদাসীন্যের মনোভাব সাধারণ মানুষের পক্ষে হজম করা একটু শক্ত।’…

নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তি নিয়ে শ্রী নীরদচন্দ্র চৌধুরী তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘দি অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ঠাকুরকে অশিক্ষিত লোক বলে গণ্য করা হতো। আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষার বাংলা পেপারে পুনর্লিখনে তাঁর লেখা থেকে অংশবিশেষ ‘সাধু ও শুদ্ধ বাংলায়’ লিখতে দেয়া হয়েছিল। এটা ঘটেছিল ১৯১৪ সালে তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির এক বছর পর। তখনও এই সাড়া জাগানো স্বীকৃতি শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশ করেনি।’ রবীন্দ্রনাথের মতো এত নিম্নমানের ইংরেজি কীভাবে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলো, সেটা নিয়েও শ্রী চৌধুরী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে সমালোচকরা যত কথাই বলুন না কেন, আমাদের স্বীকার করতে বাধা নেই যে, রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ছিল বিচিত্রমুখী। তিনি শ্রেষ্ঠ কবি কিনা, তা নিয়ে আমরা আলোচনায় মত্ত হতে পারি। কিন্তু ‘কবি গুরু’ বলে তাঁর কপালে ভক্তির চরম তিলক এঁকে দেয়া আমাদের অসম্ভব অজ্ঞতার পরিচয়কে বহন করে। গুরুবাদ প্রকৃত প্রতিভাকে আড়াল করে। গুরুরা থাকেন মাটি ও মানুষ থেকে অনেক দূরে। এ জন্যই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের তুলনামূলক বিচারে বিপিনচন্দ্র পাল বলেছেন, ‘একজন দোতালার কবি, অন্যজন সাধারণ মাটির মানুষের কবি।’ রবীন্দ্রনাথ বিচিত্রগামী ছিলেন কিন্তু সর্বত্রগামী হতে পারেননি। তাই কি নিজেই নিজের অবস্থানকে সনাক্ত করে আক্ষেপ করে বলেছিলেন:
‘যে আছে মাটির কাছাকাছি
সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।’Ñ”

এই ছিল আমার রবীন্দ্রবিরোধিতার সার্বিক চিত্র। সময় মানুষের চেতনাকে পাল্টে দেয়। দীর্ঘদিন রবীন্দ্রনাথ অধ্যয়নে আমার মনে হয়েছে যে, সব কবিকে সব দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা অনুচিত।

রবীন্দ্রনাথকে দেবতার আসনে নয়, মানুষের আসনে বসিয়ে বিচার করলে ভুল বুঝবার কোনো অবকাশ থাকে না। আমাদের বড় সীমাবদ্ধতা, যে আমরা কোনো প্রতিভাকে মহামানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে তাঁর দোষ-ত্রুটিকে নির্দেশ করতে চাই। কখনো মানুষের আসনে বসাতে চাই না। একজন মানুষ সবার সব দাবি বা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন, এমনটা নয়।

পূর্বের সঙ্গে পশ্চিমের, পশ্চিম থেকে পূর্বের; নিজের সঙ্গে প্রকৃতির, নিজের সঙ্গে জীবনের গূঢ় তাৎপর্যকে মিলিয়ে দেখা যে রবীন্দ্রনাথ তাঁকেই আমরা গ্রহণ করতে পারি না কেন? হত্যার প্রতিবাদে, জুলুমের প্রতিবাদে বৃটিশ শাসনের কাপুরুষতা, পশুত্বকে ধিক্কার জানিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথ, সেই রবীন্দ্রনাথকে আমি গ্রহণ করি। সাহিত্যে মানবমুক্তির কথা বলেছেন যে রবীন্দ্রনাথ, আমি সেই রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করি। যে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেনÑ হৃদয়ের প্রসার না ঘটলে শিক্ষা মূল্যহীন, আমি সেই রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করি।

রবীন্দ্রনাথ সত্যনিষ্ঠ জীবনের সাধক। কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীতে তাঁকে আবদ্ধ করা চলে না। হিটলার তাঁর দেশে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করেছিলেন, তারপরও হিটলারের দেশসহ বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ সমাদৃত। একসময় আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধের ষড়যন্ত্র হয়েছিল, সকল অপবাদ, প্রপাগাণ্ডাকে বিসর্জন দিয়ে বাঙালি জাতির কাছে রবীন্দ্রনাথ আজও সূর্যসম উজ্জ্বল। বুদ্ধদেব বসু ঘোষণা করেছিলেন,Ñ ‘রবীন্দ্রনাথের যুগ শেষ হয়ে গিয়েছে।’ মহৎ প্রতিভা কোনো যুগের বৃত্তে আটকে থাকেন না। তাই বুদ্ধদেবের চাইতেও রবীন্দ্রনাথের গ্রহণযোগ্যতা আজও বেশি। মহাত্মা গান্ধী সাবরমতী আশ্রমে বসে বলেছিলেন,Ñ ‘রবীন্দ্রনাথ দেশকে কিছুই দিতে পারেননি।’ তিরস্কারে জর্জরিত রবীন্দ্রনাথ বেঁচে আছেন। গান্ধী উপেক্ষিত রবীন্দ্রনাথের লেখা গান দুটি দেশের জাতীয় সংগীত হয়ে বিশাল মানবগোষ্ঠীর চেতনায় আজও জাজ্বল্যমান হয়ে আছে। কিন্তু গান্ধীর হত্যাকারীকে ভগবান বলে বিবেচনা করার লোকের অভাব নেই, তাঁর স্বপ্নের ভারতবর্ষে।

যুদ্বগ্রস্ত পৃথিবী। আজকের বিশ্ব এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে জীবনের সুকুমার বৃত্তির বিকাশ মূল্যহীন। এমন একটি সময়ে রবীন্দ্রনাথ আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তির বার্তাবাহক হয়ে উপস্থিত হন। এমন কথা এখনও কেউ বলেন, সময়ের বিবর্তনে রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখার উপযোগিতা হারিয়েছে। সত্যি কি তাই? যেখানে জীবন আছে, সেখানে জীবনের টানাপোড়েন আছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ আছেন। যেখানে আত্মার ক্ষুধা আছে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ আছেন।

এ এক বড় রহস্য, রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করতে না পারলেও উপেক্ষা করা কঠিন। যিনি রবীন্দ্রনাথকে উপেক্ষা করেন, তিনি বুঝতে পারেন না কখন রবীন্দ্রনাথ তাঁদের কাছে ধরা দেন। রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতাকে অস্বীকার করে নতুন যুগের সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন ত্রিশের দশকের যে কবিরা, তাঁরাও আক্রান্ত হন রবীন্দ্রনাথে। তাই তো সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় রবীন্দ্রনাথের হৃদমর্মরিত, পুঞ্জগুঞ্জরিত শব্দপুঞ্জের আধিক্য উপচে পড়ে। রবীন্দ্রচেতনাবিরোধী কবি বিষ্ণু দের একটি কবিতার উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে আমি আমার রবীন্দ্রবিরোধিতার ভ্রান্তি অপনোদনের সুযোগ খুঁজতে চাই। তিনি বলেছেনÑ
সুন্দরের গান যেন শুনি, গাই
দশটার পাঁচটার উদভ্রান্ত ট্রাফিকে,
বস্তিতে বাসায় আর বাংলার নয়া কলোনিতে?
জীবিকার জীবনের ভাঙা ধসা ভিতে
বোম্বাই সিনেমা আর মার্কিনী মাইকে অসুস্থ বৈভবে,
মরা ক্ষেতে কারখানায় পড়ি যেন জীবনের
সংগ্রাম শান্তির স্পষ্ট উপন্যাস,
খুঁজি যেন সকালের সূর্য থেকে সন্ধ্যার সূর্যের ছবি
শুনি যেন আমাদের কান্নার অতলজলে অমর ভৈরবী
প্রত্যহের সচেষ্ট উৎসবে,
(তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ)
পঁচিশে বৈশাখের বাইরে রবীন্দ্রনাথ নেই! অবশ্যই আছেন। ভাষা-সাহিত্য, আমাদের চেতনায় তিনি সমান দেদীপ্যমান।

ক্স রবিজীবনীÑ প্রশান্তকুমার পাল; রবীন্দ্রজীবনীÑ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়; জ্ঞানদানন্দিনী রচনা সংকলনÑ পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়; খুলনা জেলায় ইসলামÑ মুহম্মদ আবু তালিব; যশোহর খুলনার ইতিহাস, ১ম খণ্ড, ৩৩৩ পৃষ্ঠাÑ শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্র; নগেন্দ্রনাথ বসুর ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস’ গ্রন্থের ব্রাহ্মণ কাণ্ডের তৃতীয় ভাগ; ব্যোমকেশ মুস্তফীর পিরালী ব্রাহ্মণ বিবরণ, প্রথম খণ্ড; কুলাচার্য নীলমণি ভট্টের কারিকা; বাংলাপিডিয়া।

 

শেয়ার করুন
সর্বশেষ প্রকাশিত